গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কী?
গর্ভাবস্থায় প্রথমবার রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে তাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus, GDM) বলা হয়। গর্ভাবস্থার হরমোন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কিছুটা কমিয়ে দেয়, আর সেই সময় অগ্ন্যাশয় যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে রক্তে শর্করা বাড়ে। সঠিক পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করলে মা ও শিশু দুজনের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।
কখন পরীক্ষা করাতে হবে?
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস সংস্থা (ADA) সাধারণত ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে সব গর্ভবতী নারীর জন্য গর্ভকালীন ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং সুপারিশ করে। তবে নিচের ঝুঁকিগুলো থাকলে প্রথম ভিজিটেই পরীক্ষা করানো ভালো:
- ওজন বেশি বা স্থূলতা
- পিসিওএস (PCOS)
- পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস
- আগের গর্ভে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা বড় আকারের শিশু জন্ম
- ৩৫ বছরের বেশি বয়স
পরীক্ষার পদ্ধতি
সবচেয়ে সাধারণ পরীক্ষা হলো ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)। প্রথমে খালি পেটে রক্ত নেওয়া হয়, তারপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্লুকোজ পানিতে গুলে খাওয়ানো হয়, এবং ১ ও ২ ঘণ্টা পর আবার রক্ত নেওয়া হয়। কোন মাত্রাকে স্বাভাবিক ধরা হবে তা ল্যাবের নির্দেশিকা অনুযায়ী ডাক্তার ব্যাখ্যা করবেন। পরীক্ষার আগে সাধারণত কয়েক ঘণ্টা উপোস থাকতে বলা হয়; কখন কী করতে হবে তা আগেই জেনে নিন।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
নিয়ন্ত্রণ না থাকলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থেকে নিচের ঝুঁকিগুলো বাড়তে পারে:
- মায়ের জন্য: প্রিএক্ল্যাম্পসিয়া (উচ্চ রক্তচাপ), সংক্রমণ, এবং ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
- শিশুর জন্য: বেশি ওজন নিয়ে জন্ম, জন্মের পর রক্তে শর্করা কমে যাওয়া, এবং অনেক ক্ষেত্রে সিজারিয়ান ডেলিভারির প্রয়োজন
নিয়ন্ত্রণের উপায়
১. খাদ্যাভ্যাস: সুষম খাবার, পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত সবজি, মাপা ভাত বা রুটি, এবং মিষ্টি ও চিনিযুক্ত পানীয় কম। প্রতিবার অল্প অল্প করে বেশিবার খাওয়া উপকারী। খাদ্য পরিকল্পনা চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ানের সাথে ঠিক করুন।
২. শারীরিক কার্যকলাপ: চিকিৎসকের অনুমতি সাপেক্ষে প্রতিদিন হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম।
৩. রক্তে শর্করা মাপা: চিকিৎসকের নির্দেশমতো নিয়মিত পরিমাপ।
৪. ওষুধ: খাদ্য ও ব্যায়ামে যথেষ্ট না হলে চিকিৎসক ইনসুলিন বা অন্য ওষুধ লিখতে পারেন। এটি নিরাপদ এবং প্রয়োজনে নেওয়া উচিত।
নিজে কী খেয়াল রাখবেন?
খুব বেশি তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, ঝাপসা দেখা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অতিরিক্ত বমি হলে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন। রক্তে শর্করা খুব কমে গেলে (হাত কাঁপা, ঘাম, মাথা ঘোরা) মিষ্টি খাবার খেয়ে দ্রুত ডাক্তারকে জানান।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে কি স্বাভাবিক ডেলিভারি সম্ভব?
হ্যাঁ, সঠিক নিয়ন্ত্রণে বেশিরভাগ নারীর স্বাভাবিক ডেলিভারি হতে পারে। প্রসবের সময় ও পদ্ধতি চিকিৎসক শিশুর ওজন ও মায়ের অবস্থা বিবেচনা করে ঠিক করেন।
ডেলিভারির পর কি ডায়াবেটিস থাকবে?
অনেক ক্ষেত্রে ডেলিভারির পর শর্করা স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই প্রসবের পর ৬-১২ সপ্তাহে আবার পরীক্ষা করানো জরুরি।
সারসংক্ষেপ
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস একটি ব্যবস্থাপনাযোগ্য অবস্থা। ২৪-২৮ সপ্তাহে স্ক্রিনিং করান, নিয়মিত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ রাখুন, এবং খাদ্য ও শারীরিক কার্যকলাপ ঠিক রাখুন। এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য; আপনার নিজের চিকিৎসার সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের পরামর্শে নিন।
তথ্যসূত্র: American Diabetes Association Standards of Care — https://diabetesjournals.org/care · ACOG — https://www.acog.org
#গর্ভকালীন ডায়াবেটিস#OGTT#গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস#রক্তে শর্করা
এই ওয়েবসাইটের তথ্য কেবল সাধারণ সচেতনতার জন্য। চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য সরাসরি যোগাযোগ করুন।